প্রেম রাওয়াত: অপূর্ব বাদ্যযন্ত্র

যাঁরা এই জীবন সম্পর্কে কিছু শিখতে চান, তাঁদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাওয়া আমার কাছে সবসময়ই এক বিরাট সম্মানের বিষয়।

আমি আপনাদের একটি খুব সহজ গল্প বলতে চাই।

বেহালাবাদকের শিল্পিত চিত্র

একসময় একটি অপূর্ব বাদ্যযন্ত্র ছিল।

যখন সেটি বাজানো হতো, তখন তা থেকে সবচেয়ে সুন্দর সুর ভেসে আসত।

তারপর মানুষ 'নতুন আর অন্যরকম' বাদ্যযন্ত্রের দিকে আকৃষ্ট হতে শুরু করল এবং অন্য সংগীতশিল্পীদের এসে বাজানোর জন্য আমন্ত্রণ জানাল।

সংগীতশিল্পীরা তাঁদের ঢোল, বাঁশি আর গিটার নিয়ে এলেন।

কিছুদিনের মধ্যেই সেই বিশেষ বাদ্যযন্ত্রটি কীভাবে বাজাতে হয়, তা আর কেউ জানত না। মানুষ ভাবতে শুরু করল, 'এই বাদ্যযন্ত্রটির আর কী প্রয়োজন?'

বাদ্যযন্ত্রটি ছিল সুন্দর এবং মানুষের কৌতূহল জাগাত। কিন্তু অবহেলায় পড়ে থাকতে থাকতে ধীরে ধীরে তার ওপর ধুলো জমতে লাগল, আর তার সুরও বেসুরো হয়ে গেল।

স্যাক্সোফোনবাদকের শিল্পিত চিত্র

একদিন একজন লোক এসে বললেন, 'আপনারা এই অসাধারণ সুন্দর বাদ্যযন্ত্রটিকে একপাশে সরিয়ে রেখেছেন কেন?'

মানুষ অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকাল। 'কোন বাদ্যযন্ত্র? ঢোলগুলো সব ঠিকঠাক সুরে বাঁধা আছে, বাঁশিগুলো চমৎকার, বেহালাগুলো নিখুঁত, পিয়ানোটিও সঠিক সুরে রয়েছে।'

তিনি বললেন, 'আপনাদের কি এই বাদ্যযন্ত্রটির কথা মনে নেই? এই বাদ্যযন্ত্রটির জন্যই তো আপনাদের সংগীতের প্রতি আগ্রহ জন্মেছিল। আপনারা এই জায়গাটি তৈরি করেছিলেন এবং এর সুর শোনার জন্য একত্র হয়েছিলেন। অথচ এখন নতুন আর অন্যরকম জিনিসের প্রতি কৌতূহল আপনাদের এমনভাবে টেনে নিয়ে গেছে যে, আপনারা একে অবহেলা করছেন।'

হার্পবাদকের শিল্পিত চিত্র

'এই বাদ্যযন্ত্রটির মধ্যে এমন কী বিশেষত্ব আছে?' তারা জিজ্ঞাসা করল।

লোকটি বললেন, 'আমি আপনাদের দেখাচ্ছি।' তিনি বাদ্যযন্ত্রটি পরিষ্কার করলেন, আর সেটি আবার ঝলমল করে উঠল।

আমরা ভুলে যাই। আমরা শুধু ওপরের জমে থাকা ধুলোই দেখতে পাই।

কিন্তু যিনি এই বাদ্যযন্ত্রটিকে সত্যিই চেনেন, তিনি সেই ধুলোর আড়ালেও দেখতে পান। তিনি ধুলো সরিয়ে তার সৌন্দর্য, দীপ্তি, আকর্ষণ আর মহিমাকে আবার প্রকাশ করতে পারেন।

তারপর তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করলেন—বাদ্যযন্ত্রটিকে আবার সঠিক সুরে বাঁধলেন। কারণ একটি বাদ্যযন্ত্র থেকে সুন্দর সুর বেরোতে হলে সেটিকে সঠিকভাবে সুরে বাঁধতে হয়।

সুরে বাঁধার পর তিনি বাদ্যযন্ত্রটি মানুষদের ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, 'এবার আপনারা বাজান।'

তারা বলল, 'কিন্তু আমরা তো বাজাতে জানি না।'

তিনি বললেন, 'শুধু তারগুলো আলতো করে টানুন, তাহলেই সুর উঠবে। শুনুন। আপনারা শুনতে পাবেন।'

তারা যখন বাজাতে শুরু করল, সেই অপূর্ব সুরে মুগ্ধ হয়ে গেল।

এমনই এক বাদ্যযন্ত্র ছিল সেটি, যার সুর সত্যিই হৃদয়কে স্পর্শ করতে পারত।

বাঁশিবাদকের শিল্পিত চিত্র

সেই বাদ্যযন্ত্রটি কী?

সেটি আপনি নিজেই।

'নতুন আর অন্যরকম' কিছুর পেছনে ছুটতে গিয়ে আপনি নিজেকেই ভুলে গেছেন।

সবকিছুই এখন 'নতুন আর অন্যরকম' জিনিসের আকর্ষণকে ঘিরে—শুধু এই বাদ্যযন্ত্রটি, এই জীবনটি ছাড়া।

এই হৃদয়টি ছাড়া।

অন্য সবকিছুই অগ্রাধিকার পায়।

সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আপনি বলেন, 'আমাকে এটা করতে হবে। আমাকে ওটা করতে হবে।' কিন্তু সেই তালিকায় আপনি নিজে কোথায় আছেন? দশ নম্বরে? কুড়ি নম্বরে? একশো নম্বরে?

না। কোথাও নেই।

পিয়ানোবাদকের শিল্পিত চিত্র

যখন এই বাদ্যযন্ত্রটি সঠিক সুরে বাঁধা হবে এবং আপনি সেটি বাজাতে শুরু করবেন, তখন আপনি একটি সুর শুনতে পাবেন—আপনার কাছে আসা প্রতিটি শ্বাসের সুর।

বিষয়টি খুবই সহজ।

আপনি যা খুঁজছেন, আপনার যা প্রয়োজন, তা আপনার নিজের মধ্যেই রয়েছে। কিন্তু অবহেলার কারণে সেটি বেসুরো হয়ে পড়েছে।

আবার সঠিক সুরে বাঁধা হলে আপনি এই বাদ্যযন্ত্রটির সম্ভাবনা উপভোগ করতে পারবেন।

এটি আপনার জীবন। সেই পরিতৃপ্তিকে খুঁজে নিন।

অন্তত এটুকু তো আপনি নিজের কাছে ঋণী।

আপনি যদি সত্যিই সমৃদ্ধ হতে চান, তাহলে নিজেকে দিয়েই শুরু করুন।

আপনার প্রথম যে ঋণটি শোধ করা প্রয়োজন, তা আপনার নিজের হৃদয়ের কাছে—তার আহ্বান এবং পরিপূর্ণ হওয়ার আকাঙ্ক্ষার প্রতি।

বক্তব্য রাখছেন প্রেম রাওয়াত

এটি খুব বড় কোনো চাওয়া নয়।
বিষয়টি সহজ।
পরিপূর্ণ হোন।

চেলোবাদকের শিল্পিত চিত্র

— প্রেম রাওয়াত